একটি শিশুর মৃত্যু, আর একটি মায়ের প্রশ্ন—হামের টিকা সংকটের দায় কার?
একটি সন্তান হারানোর কষ্ট কোনো ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। আর যখন কোনো মা-বাবার মনে প্রশ্ন জাগে—সময়মতো টিকা পাওয়া গেলে হয়তো সন্তানটি বেঁচে যেত—তখন সেই প্রশ্ন শুধু একটি পরিবারের থাকে না, সেটি রাষ্ট্রের কাছেও জবাবদিহির প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
২০২৬ সালে বাংলাদেশ ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি হয়েছে। ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল—হাসপাতালগুলোতে অসুস্থ শিশুদের ভিড় এবং অনেক পরিবারের সন্তান হারানোর ঘটনা সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিভিন্ন প্রতিবেদনে টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি, সরবরাহ সংকট এবং আগের সময়ের টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার বিষয়গুলো উঠে এসেছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই সন্তান হারানো এক মা গণমাধ্যমের সামনে এসে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল প্রশ্ন—যে সময়ে শিশুদের সুরক্ষার জন্য টিকা প্রয়োজন ছিল, সেই সময়ে কেন টিকার সংকট তৈরি হলো? কেন অনেক শিশু সময়মতো টিকার আওতায় আসতে পারল না?
এ প্রশ্নের সঙ্গে এখন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহির বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে হাম-রুবেলা টিকা সংগ্রহের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। এ নিয়ে টিকা সরবরাহে বিলম্ব ও সংকটের অভিযোগ উঠেছে। UNICEF-এর মাধ্যমে প্রচলিত সংগ্রহব্যবস্থা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়।
এমনকি এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করার আবেদনও করা হয়েছিল। আবেদনে অভিযোগ করা হয়, সময়মতো টিকা সংগ্রহ না হওয়ায় শিশুদের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে এবং পরবর্তীতে হামের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব ঘটে। তবে আদালত সেই মামলা করার আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন। তাই অভিযোগগুলোকে আদালতে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না।
তবু সাধারণ মানুষের প্রশ্ন থেকেই যায়—
যদি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে টিকা সরবরাহে সমস্যা হয়ে থাকে, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের দায় কার?
যদি আগে থেকেই সম্ভাব্য টিকা সংকটের সতর্কতা থেকে থাকে, তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি?
আর যদি একটি শিশুর জীবন সময়মতো টিকা দিয়ে রক্ষা করা সম্ভব হয়ে থাকে, তাহলে সেই সুযোগ কেন হারিয়ে গেল?
WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের হামের প্রাদুর্ভাবে বিপুলসংখ্যক শিশু আক্রান্ত হয়েছে এবং মৃত্যুও ঘটেছে। UNICEF, WHO ও Gavi মিলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিও শুরু করে।
তাই এই প্রতিবাদ কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার জন্য নয়। এটি সেইসব বাবা-মায়ের প্রশ্নের প্রতিধ্বনি, যারা সন্তান হারিয়েছেন এবং জানতে চান—কোথায় ছিল রাষ্ট্রের সুরক্ষা ব্যবস্থা?
একজন মা যখন সন্তানের ছবি হাতে নিয়ে কাঁদেন, তখন তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় থাকে না। সেখানে থাকে শুধু একজন মায়ের বুকভাঙা কান্না।
শিশুর মৃত্যু নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক হতে পারে, প্রশাসনিক দায় নিয়ে তদন্ত হতে পারে, আদালতে অভিযোগ উঠতে পারে—কিন্তু সবচেয়ে জরুরি হলো সত্য উদঘাটন।
কোন সিদ্ধান্তে টিকা সংকট তৈরি হয়েছিল?
কখন সংকটের সতর্কতা পাওয়া গিয়েছিল?
কেন টিকা সময়মতো পৌঁছায়নি?
কত শিশু টিকা না পাওয়ার কারণে ঝুঁকিতে পড়েছিল?
এবং এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য প্রশাসনিকভাবে কার কতটা দায়—তা একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তেই পরিষ্কার হওয়া উচিত।
আজ যে মা সন্তান হারিয়েছেন, তাঁর কান্নার জবাব রাজনৈতিক স্লোগানে নয়—সত্য, তদন্ত ও জবাবদিহির মাধ্যমে দিতে হবে।
একটি শিশুর মৃত্যু যেন আরেকটি শিশুর ভবিষ্যৎ মৃত্যুর কারণ না হয়।
সময়মতো টিকা, স্বচ্ছ স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি—প্রতিটি শিশুর অধিকার।

কোন মন্তব্য নেই
আপনার মন্তব্য শেয়ার করুন।